নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে আলুর বাজারে ধস নেমেছে। উৎপাদন ও সংরক্ষণে খরচের তুলনায় দাম কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে বীজ আলুর দাম না থাকায় হিমাগারের ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। এতে কয়েক কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।এদিকে সরকারি নির্ধারিত সংরক্ষণ ভাড়ার চেয়ে হিমাগারগুলোতে কৌশলে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চাষি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের ভাড়া ৬ টাকা নির্ধারণ করলেও কোনো কোনো হিমাগারে বস্তাপ্রতি ৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উৎপাদন থেকে হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতি কেজি আলুতে চাষি ও ব্যবসায়ীদের খরচ পড়েছে প্রায় ২২ থেকে ২৪ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে খাওয়ার আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে হিমাগারে বীজ আলুর দামও ১০ থেকে ১৫ টাকা কেজির মধ্যে। ফলে উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদের।বস্তাপ্রতি ৪০০ টাকা ভাড়ার অভিযোগকিশোরগঞ্জ উপজেলার মুক্তা হিমাগারে অতিরিক্ত সংরক্ষণ ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষক সোহেল রানা। এ বিষয়ে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।অভিযোগে সোহেল রানা বলেন, তিনি বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা হিসাবে ১৫০ বস্তা আলু মুক্তা হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। সম্প্রতি ৩৫ বস্তা আলু বের করতে গেলে হিমাগার কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ৪১০ টাকা করে সংরক্ষণ ভাড়া নেয়। এ–সংক্রান্ত ক্যাশ মেমো ও গেট পাসের নম্বর ১৮৪৯০ ও ১৮৪৮৯।অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে হিমাগার কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ’ বলে জানায় বলে অভিযোগ করেন সোহেল রানা। পরে বাধ্য হয়ে তিনি থানায় অভিযোগ করেন।মুক্তা হিমাগারে বীজ আলু নিতে আসা পুটিমারী ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের কৃষক সানার আলী বলেন, তিনি ওই হিমাগারে ৩৫০ বস্তা বীজ আলু সংরক্ষণ করেছেন। এর মধ্যে ১৫০ বস্তা বের করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারি হিসাবে প্রতি কেজি ৬ টাকা ভাড়া নির্ধারিত হলেও তাঁর কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ৪০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।আরেক কৃষক আনারুল ইসলাম বলেন, তিনি ক্ষুদ্র কৃষক। হিমাগারে ২০ বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। হিমাগার কর্তৃপক্ষ প্রতি বস্তায় ৫৫ থেকে ৬০ কেজি আলু রাখতে বলে। ৫৫ কেজি আলুর ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী ৩৩০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ৪০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।কয়েক কোটি টাকা লোকসানের শঙ্কাআলু ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, গত তিন বছর ধরে বিভিন্ন হিমাগারে হাজার হাজার বস্তা বীজ ও খাওয়ার আলু সংরক্ষণ করে তিনি কয়েক কোটি টাকা লোকসান করেছেন। এবারও একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে।তিনি বলেন, উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কম হওয়ায় আলু বিক্রি করে মূলধন ফেরত পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।মুক্তা হিমাগারের ব্যবস্থাপক হামিদুল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ‘মালিকপক্ষ যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, সেভাবেই কাজ হচ্ছে। এর বাইরে কিছু বলা সম্ভব নয়।’উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কম: কৃষি কর্মকর্তাকিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, চাহিদার তুলনায় এ বছর আলুর উৎপাদন বেশি হয়েছে। পাশাপাশি বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যা না হওয়ায় অন্যান্য সবজির উৎপাদনও বেড়েছে। এ কারণে আলুর দাম কমেছে।হিমাগারে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়া হলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিয়ে থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি শুনলাম। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।’কিশোরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, হিমাগারে বীজ আলুর বস্তাপ্রতি বেশি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে।আলুর দাম কমে যাওয়া এবং হিমাগারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের কারণে চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত বাজারদর ও সংরক্ষণ ভাড়ার বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে চলতি মৌসুমে তাঁদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।