গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের স্তূপ
গণপূর্ত অধিদপ্তরে
বদলি-পদায়ন, টেন্ডার এবং প্রকল্পের অর্থ
ছাড়কে ঘিরে একটি প্রভাবশালী
বলয়ের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে।
এই বলয়ের সঙ্গে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর
ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তিন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর
নাম আলোচনায় এসেছে। অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা তাঁদের ‘তিন পাণ্ডব’ নামে
অভিহিত করেন।অভিযোগের তালিকায়
রয়েছেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১
থেকে সম্প্রতি বদলি হওয়া তত্ত্বাবধায়ক
প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান এবং
ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক
প্রকৌশলী ড. আবু নাসের
চৌধুরী।সংশ্লিষ্ট কয়েকজন
প্রকৌশলীর অভিযোগ, পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা, নির্দিষ্ট
ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া
এবং প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে প্রভাব
বিস্তারের মতো ঘটনা ঘটেছে।
অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও কোনো
কোনো ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও তাঁদের
দাবি।তবে সারোয়ার
জাহান ও আবু নাসের
চৌধুরী এসব অভিযোগ অস্বীকার
করেছেন। বদরুল আলম খানের বক্তব্য
জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর
বক্তব্য পাওয়া যায়নি।বদরুলকে ঘিরে বড় প্রকল্পের অভিযোগতিন প্রকৌশলীর
মধ্যে মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে
বেশি অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি
করেছেন। জরুরি কাজের কথা বলে টেন্ডার
ছাড়াই মন্ত্রীর সরকারি বাংলোর সংস্কারকাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। কাজের
ব্যয় বাড়িয়ে দেখিয়ে অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগও
করেছেন সংশ্লিষ্টরা।সাভার সার্কেলে
দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর আস্থাভাজন
হিসেবে পরিচিত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেজবুল কবিরকে
গাজীপুরে দায়িত্ব দেওয়ার পর ঠিকাদারদের সঙ্গে
সমন্বয় করে কাজ বণ্টনের
অভিযোগ ওঠে।অভিযোগে গাজীপুরের
কৃষি বিপণন ভবন নির্মাণে প্রায়
৫ কোটি টাকা, বিএসটিআই
সিভিল প্রকল্পে ১৫ কোটি ৪১
লাখ, মহানগর সদর থানায় ২০
কোটি ২৪ লাখ, সদর
উপজেলা মডেল মসজিদে ১৪
কোটি ৬১ লাখ, কালিয়াকৈর
থানায় প্রায় ১০ কোটি, পুবাইল
থানায় ১৬ কোটি ২৪
লাখ এবং কোনাবাড়ী থানায়
প্রায় ১৫ কোটি ৮২
লাখ টাকার প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা
হয়েছে। তবে এসব প্রকল্পের
প্রতিটিতে অনিয়ম হয়েছে বা একই ব্যক্তির
প্রভাব ছিল এমন তথ্য
স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।তাজউদ্দীন আহমদ
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম
নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর মন্ত্রণালয়ের
নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্য খাতের
অর্থ ব্যবহার করা হয়। ঠিকাদারকে
প্রায় ৪ কোটি টাকা
অগ্রিম বিল দেওয়া হলেও
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ
হয়নি। কাজ শেষ করতে
আরও ৬ থেকে ৮
কোটি টাকা প্রয়োজন হতে
পারে বলে তাঁদের দাবি।মিরপুরের পাইকপাড়া
আবাসিক প্রকল্প এবং পুলিশের ১০৭
থানার প্রকল্পের আওতায় ভাসানটেক থানার কাজও পছন্দের ঠিকাদারকে
দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।প্রকৌশলীদের ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগবদরুল আলমকে
ঘিরে নারীকে ব্যবহার করে প্রকৌশলীদের কাছ
থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টার
অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি, কোনো কোনো ঘটনায়
২০ থেকে ২৫ লাখ
টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে।খুলনা গণপূর্তের
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম
বলেন, ঢাকায় দায়িত্ব পালনের সময় এক নারী
তাঁকে ফোন করে ব্ল্যাকমেইলের
চেষ্টা করেন। পরে তিনি জানতে
পারেন, ওই নারী বদরুল
আলমকে চিনতেন। আতিকুলের দাবি, একপর্যায়ে বদরুল তাঁকে বিষয়টি মীমাংসার কথা বলেন। এরপর
তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া
হয় এবং প্রায় ছয়
মাস পর খুলনায় বদলি
করা হয়।বদলি নিয়ে সারোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগবদলি-পদায়নে
অনিয়ম ঠেকাতে মন্ত্রণালয় লটারির ব্যবস্থা চালু করেছে। এর
মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, লটারির আগে ঢাকা জেলার
উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে ৪১ জনের
নাম বাক্সে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এ
ঘটনায় সারোয়ার জাহানের নাম আলোচনায় এসেছে।এর আগে
গাজীপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকার সময় এক ঠিকাদারের
১০ লাখ টাকা নিরাপত্তা
জামানতের পে-অর্ডার বেআইনিভাবে
ভাঙানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০২৩ সালের ৫ আগস্ট ঠিকাদারের
অভিযোগের পর গণপূর্ত অধিদপ্তর
তদন্ত কমিটি গঠন করে। সংশ্লিষ্ট
সূত্রের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে তাঁর
বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়।এরপরও তাঁকে
পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাপন
শাখায় দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত ৩
মার্চ এক দিনে ৫০
জনের বেশি প্রকৌশলীকে বদলি
নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগের পর
মন্ত্রণালয় ওই গণবদলি আদেশ
স্থগিত করে। এর আগে
৯ ডিসেম্বর তিন প্রকৌশলীর বদলি
নিয়েও অভিযোগ ওঠে এবং পরে
তাঁদের বদলি আদেশ স্থগিত
করা হয়। এসব বিষয়ে
দুদকেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।সারোয়ার জাহান
বলেন, বদলি-পদায়নের বিষয়গুলো
মন্ত্রণালয় জানে। লটারির বাক্সে আগে থেকে নাম
ঢোকানোর বিষয়টি তাঁর জানা নেই।
মন্ত্রণালয়ই বদলি করেছে বলে
দাবি করেন তিনি।আবু নাসেরকে ঘিরেও প্রশ্নঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক
প্রকৌশলী ড. আবু নাসের
চৌধুরীর বিরুদ্ধে কাজের অগ্রগতির তুলনায় বেশি অর্থ পরিশোধ,
অতিরিক্ত ব্যয় এবং পছন্দের
ঠিকাদারকে কাজ দিতে নির্বাহী
প্রকৌশলীদের ওপর চাপ দেওয়ার
অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সার্কেলের বিভিন্ন
কাজ নিয়ে শতাধিক অডিট
আপত্তি রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।সচিবালয়, হাইকোর্ট
ও আশপাশের সরকারি হাসপাতাল ঢাকা সার্কেল-২-এর আওতায়। এসব
স্থাপনার সংস্কারকাজ পরিচিত ঠিকাদারদের দেওয়ার নির্দেশনা এবং কোনো কোনো
হাসপাতালের সংস্কার বিল দ্বিগুণ দেখানোর
অভিযোগও রয়েছে। বগুড়ায় দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে
টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগ ওঠার কথাও জানিয়েছেন
সংশ্লিষ্টরা।আবু নাসের
বলেন, ‘স্যার আমাকে বগুড়া থেকে ঢাকা নিয়ে
এসেছেন; কিন্তু কোনো সিন্ডিকেট-অনিয়মের
সঙ্গে আমি জড়িত নই।’মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যগৃহায়ণ ও
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর
রহমান বলেন, প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে সিন্ডিকেট ও
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে তাঁরা বিভিন্ন অভিযোগ শুনেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনও তাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন। একজন কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ওএসডি করা হয়েছে। অন্যদের
বিরুদ্ধেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া
হবে বলে জানান তিনি।গণপূর্তের
বদলি-পদায়ন, টেন্ডার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন
নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা
যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, টেন্ডার প্রক্রিয়া,
প্রকল্পের বিল ও অডিট
আপত্তি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।