ঢাকা    শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
365 D News

জেন-জি আন্দোলনে নতুন করে আলোচনায় দিল্লির যন্তর মন্তর

ন্যায়বিচার, চাকরি ও নাগরিক অধিকার আদায়ের দাবিতে বছরের পর বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হচ্ছেন দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে। একসময় মহাকাশের গতি ও সময় পরিমাপের জন্য নির্মিত এই স্থাপনা এখন ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।মহাকাশের গতি ও সময় পরিমাপের উদ্দেশ্যে ১৭২৪ সালে দিল্লিতে নির্মিত হয়েছিল যন্তর মন্তর। প্রায় তিন শতাব্দী পর ২০২৬ সালে আবারও আলোচনায় এসেছে ঐতিহাসিক এই মানমন্দির। তবে এবার জ্যোতির্বিজ্ঞানের কারণে নয়, বরং এর রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং জেন-জি আন্দোলনের নতুন তৎপরতার জন্য।দিল্লির কনট প্লেসের কাছাকাছি লাল পাথরের এই স্থাপনার আশপাশে এখন জড়ো হন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ, ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারী, কৃষক, কর্মচারী, শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। অনশন, পুলিশি হেফাজত, সরকারি আশ্বাস এবং দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁদের অনেকের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটে যাচ্ছে। বেকারত্ব, অপূর্ণ স্বপ্ন ও অধিকার আদায়ের আকুতি নিয়ে তাঁরা বারবার হাজির হচ্ছেন এই প্রতিবাদস্থলে।অশোকা রোড ও টলস্টয় মার্গের মাঝখানে অবস্থিত যন্তর মন্তর ভারতের রাজধানীতে প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার আন্দোলন সহজেই জনসাধারণের নজরে আসে। গত কয়েক মাসে জেন-জি আন্দোলন এই পুরোনো প্রতিবাদস্থলে নতুন গতি এনেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে অনলাইনে জন্ম নেওয়া ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া থেকে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলনও এখানে এসে পৌঁছেছে।যন্তর মন্তরের প্রতিটি প্রতিবাদ রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে আনে। এখানে কেউ চাকরি চান, কেউ ন্যায়বিচার, কেউবা নিজের হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি জানান। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও এই প্রতিবাদের অন্যতম বিষয়। ফলে স্থানটি কেবল আন্দোলনের মঞ্চ নয়, স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক উন্মুক্ত আর্কাইভে পরিণত হয়েছে।যেভাবে প্রতিবাদের কেন্দ্রে যন্তর মন্তরএকসময় দিল্লিতে বড় ধরনের প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান স্থান ছিল রাজপথের—বর্তমানে কর্তব্য পথ—কাছের বোট ক্লাবের লন। সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন এবং নর্থ ও সাউথ ব্লকের কাছাকাছি হওয়ায় জায়গাটি ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রের ওপর চাপ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।১৯৮৮ সালে কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে হাজার হাজার কৃষক সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থান করেন। তাঁরা তাঁবু খাটান, রান্না করেন এবং গবাদিপশু নিয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাঁদের এই বিশাল সমাবেশ সরকারকে চাপে ফেলে।১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত বোট ক্লাব ছিল ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তবে ১৯৯৩ সালের দিকে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকলে প্রশাসন রাজপথ থেকে বিক্ষোভ সরিয়ে নিতে শুরু করে। তখন বিকল্প প্রতিবাদস্থল হিসেবে গুরুত্ব পায় যন্তর মন্তর। সংসদের কাছাকাছি হলেও এটি একেবারে সংসদ ভবনের পাশে নয়। জনসাধারণের নজরে থাকার পাশাপাশি জায়গাটিকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রাখাও তুলনামূলক সহজ।আকাশের মানচিত্র থেকে গণতন্ত্রের চিত্রযন্তর মন্তরের স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন জয়পুরের শাসক সওয়াই জয় সিং। এর বিভিন্ন কাঠামো ব্যবহার করে খালি চোখে সময় এবং মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হতো। ‘সম্রাট জয়প্রকাশ যন্ত্র’সহ এসব স্থাপনা একসময় পৃথিবী ও মহাজাগতিক গতির সম্পর্ক বোঝার কাজে ব্যবহৃত হতো।লেখক পল লুন্ডে তাঁর ‘জয় সিং অ্যান্ড দ্য যন্তর মন্তর’ বইয়ে জয় সিংয়ের বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। স্থাপত্য ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে নির্মিত এই মানমন্দিরের কাঠামোগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য, শিল্প ও পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এমেরিটাস ব্যারি পার্লাস এবং স্থপতি ও ইতিহাসবিদ অনীশা শেখর মুখার্জিও।কিন্তু সময়ের সঙ্গে যন্তর মন্তরের পরিচয়ে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। যে স্থাপনা একসময় আকাশের গতিবিধি পরিমাপ করত, তার পাশের সড়কে এখন নাগরিকেরা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্বের হিসাব তুলে ধরছেন। সংবিধান নাগরিকদের ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও নিজেদের দাবি জানাতে তাঁদের নানা অনুমতি, বিধিনিষেধ ও সময়সীমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়—এই বৈপরীত্যও এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।স্বাধীনতার পর প্রতিবাদের নতুন ঠিকানাযন্তর মন্তরকে প্রতিবাদের কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল মূলত ভারতের স্বাধীনতার পর। ১৯১১ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ শাসকেরা দিল্লিকে কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। এর ফলে প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয় এবং সেই ক্ষমতাকেন্দ্রের আশপাশের জনপরিসর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।ইতিহাস গবেষক হারলিন কাউরের গবেষণায় পার্লামেন্ট স্ট্রিট, বোট ক্লাব, রামলীলা ময়দান ও যন্তর মন্তরকে জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষের উপস্থিতি এসব স্থানকে প্রতিবাদের মঞ্চে পরিণত করেছে। একই সঙ্গে সরকারি অনুমতি, নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও এসব স্থানের রাজনৈতিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করেছে।দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পুষ্পাঞ্জলি ঝার গবেষণায় যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের ব্যাপকতার চিত্র পাওয়া যায়। পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার নথির ভিত্তিতে করা সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেখানে অন্তত ১৩ হাজার ১১৮টি ধর্না এবং ৫ হাজার ৪৯১টি বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। শুধু ২০১০ সালের প্রথম আট মাসেই বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ অংশ নেন। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হন ১২ হাজারের বেশি মানুষ।এই পরিসংখ্যান দেখায়, যন্তর মন্তরে শুধু বড় আন্দোলনই হয়নি; ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট ছোট জনগোষ্ঠীও নিজেদের দাবি ও অভিযোগ নিয়ে নিয়মিত রাজধানীতে এসেছে।যেসব আন্দোলন বদলে দিয়েছে যন্তর মন্তরের পরিচয়১৯৯০-এর দশকে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের কর্মীরা বড় বাঁধ নির্মাণের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্দশা তুলে ধরতে যন্তর মন্তরকে ব্যবহার করেন। গ্রাম হারানো, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি ও অপর্যাপ্ত পুনর্বাসনের মতো বিষয় সামনে আনেন মেধা পাটকর ও তাঁর সহকর্মীরা। প্রত্যন্ত নদী অববাহিকার মানুষের দাবিকে তাঁরা রাজধানীর রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে আসেন।২০১১ সালে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন যন্তর মন্তরকে টেলিভিশন ও গণমাধ্যমের যুগে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদস্থলে পরিণত করে। ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া তাঁর অনশন দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সাদা গান্ধী টুপি, ত্রিবর্ণ পতাকা, মোমবাতি ও ‘আমি আন্না’ স্লোগান আন্দোলনের পরিচিত প্রতীক হয়ে ওঠে।২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে এক তরুণীকে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর তরুণ-তরুণীরা ইন্ডিয়া গেট, রাইসিনা হিল ও যন্তর মন্তরে প্রতিবাদে জড়ো হন। ভয়, শোক, অপমান ও ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এসব সমাবেশে কোনো একক নেতার নেতৃত্ব ছিল না।২০১৫ সালে সাবেক সেনাসদস্যরা ‘এক পদ, এক পেনশন’ দাবিতে মাসের পর মাস অবস্থান করেন। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তাঁরা নিজেদের পদক সরিয়ে রাখেন। ২০১৭ সালে তামিলনাড়ুর খরাকবলিত কৃষকেরা কৃষিসংকটের চিত্র তুলে ধরতে দিল্লিতে এসে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ করেন। কেউ অর্ধনগ্ন অবস্থায় থাকেন, কেউ ঘাস খান, আবার কেউ দাঁত দিয়ে ইঁদুর ধরেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের দুর্দশার প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।এভাবে বিভিন্ন সময় কৃষক, সেনাসদস্য, নারী অধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের প্রতিবাদে যন্তর মন্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।প্রতিবাদের অধিকার বনাম জনদুর্ভোগযন্তর মন্তরে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অসন্তোষও তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লাউডস্পিকার ব্যবহার, যান চলাচল বন্ধ রাখা, অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ, রান্না ও রাতযাপনের কারণে শব্দদূষণসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। এতে আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়।২০১৭ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত পরিবেশগত ও নাগরিক উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদে নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং প্রায় চার কিলোমিটার দূরের রামলীলা ময়দানকে অবস্থান কর্মসূচির বিকল্প স্থান হিসেবে নির্ধারণ করে। বিষয়টি পরে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।২০১৮ সালের ২৩ জুলাই ‘মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠন বনাম ভারত সরকার’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।অর্থাৎ, একদিকে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে অন্য মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সুরক্ষিত রাখা—দুটিই গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী অঁরি লেফেভর তাঁর ‘রাইট টু দ্য সিটি’ বইয়ে শহরের অধিকার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শহরে উপস্থিত থাকা, শহরকে ব্যবহার করা এবং হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। যন্তর মন্তরের প্রতিবাদগুলোতেও এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। ক্ষমতাকেন্দ্রের বাইরে থাকা মানুষ পোস্টার, স্লোগান, অনশন ও সশরীর উপস্থিতির মাধ্যমে নিজেদের কথা রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।দিল্লির যন্তর মন্তরের ইতিহাস তাই কেবল প্রাচীন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক স্থাপনার ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, অধিকার আদায়ের লড়াই এবং গণতন্ত্রের কার্যকারিতা বোঝারও একটি জানালা। একসময় যে স্থাপনা আকাশের গতি মাপত, তার পাশের সড়ক এখন যেন মাপছে গণতন্ত্রের স্পন্দন—রাষ্ট্র কতটা শুনছে মানুষের কথা, আর নিজেদের দাবি জানাতে নাগরিকদের কতটা পথ পেরোতে হচ্ছে।

জেন-জি আন্দোলনে নতুন করে আলোচনায় দিল্লির যন্তর মন্তর