ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
365 D News

ছয় মাসে হামে হাজার শিশুর মৃত্যু, টিকাহীন ১০ জনে প্রায় ৯ জন

একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক সাফল্যের উদাহরণ ছিল বাংলাদেশ। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর হামে কোনো মৃত্যুর রেকর্ডও ছিল না। অথচ চলতি বছর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে এক হাজারের বেশি শিশু। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশু।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার আওতার বাইরে ছিল। নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়া শিশুদের ৮০ শতাংশ এবং মৃত শিশুদের ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি। অর্থাৎ হামে মৃত ১০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জনই ছিল টিকাহীন।বয়সভিত্তিক তথ্যেও ঝুঁকির চিত্র স্পষ্ট। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা মোট আক্রান্তের ১০ শতাংশ হলেও তাদের মৃত্যুর হার ২০ শতাংশ। অন্যদিকে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। মোট আক্রান্তের ২৮ শতাংশ এই বয়সী। এ বয়সে মৃত্যুর হার ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই হামের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ফলে দুই ডোজ টিকাদান কর্মসূচি থাকার পরও হাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।সরকারের পক্ষ থেকে এ পরিস্থিতির জন্য আগের দুই সরকারের সময়কার ব্যর্থতাকে দায়ী করা হচ্ছে। গত এপ্রিল থেকে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হলেও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রত্যাশা ছিল, এর ফলে দ্রুত শিশুদের মধ্যে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে এবং সংক্রমণ কমবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা, নজরদারি, জনবল ও প্রস্তুতির ঘাটতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের সমন্বয়হীনতাও পরিস্থিতি জটিল করেছে।চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি ও টিকার ঘাটতির পাশাপাশি হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, অ্যাডেনো ভাইরাস, ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া, সেপসিস, মেনিনজাইটিস ও এনসেফালাইটিস দেখা দিচ্ছে। এসব জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়ছে।হাজার ছাড়িয়েছে মৃত্যুচলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে প্রথম হামের রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ধীরে ধীরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৫ মার্চ থেকে সরকারি তথ্য প্রকাশ শুরু করে। ১০ এপ্রিল থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করে অধিদপ্তরের এমআইএস শাখা।এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ছিল ৪০ হাজার ৭০৮ জন। তখন মৃত্যু হয়েছিল ২৭৬ জনের। ২২ জুলাই মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০ ছাড়ায়। আগস্টে নতুন করে আক্রান্ত হয় ৩২ হাজার ৯৩৪ জন এবং মারা যায় ১৩৬ শিশু। ১৫ আগস্ট পাঁচ মাসের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যায়।সর্বশেষ চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম নয় দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৯ হাজার ১১৯ জন। এ সময়ে মারা গেছে ২৮ শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১ হাজার ২ শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের। বাকি ৯০২ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে।এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ শিশু। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০ জনের হামের উপসর্গ রয়েছে এবং ১৯ হাজার ৯০৪ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে।বিভাগগুলোর মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকায়। এ বিভাগে মারা গেছে ৪৬৭ শিশু। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪০৪ জন। আক্রান্ত হয়েছে ৮৪ হাজার ২৩৩ জন; নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১২ হাজার ১৯৫ শিশুর।টিকাদানে ঘাটতিপরিস্থিতির অবনতি হলে সমালোচনার মুখে সরকার জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকির ৩০ উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া শুরু করে। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়। কর্মসূচি শেষ হয় ২০ মে।সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১ কোটি ৯৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯১২ শিশু টিকা পেয়েছে। ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশু।তবে গত জুনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা পাওয়া যায় প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ। সেই হিসাবে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের আওতার বাইরে থেকে গেছে প্রায় ৪৬ লাখ ৩৬ হাজার শিশু।কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না হামবিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিরুদ্ধে কার্যকর ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। বর্তমান টিকাদানের হার সেই লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকায় সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এর সঙ্গে অপুষ্টি, চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং নিউমোনিয়া ও অ্যাডেনো ভাইরাসের মতো সহ-সংক্রমণ মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।ইপিআই উপপরিচালক ডা. সাব্বির হায়দার বলেন, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সাধারণত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে সাময়িক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পায়। কিন্তু বর্তমানে টিকা দেওয়ার নির্ধারিত বয়সের আগেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে ধারণা করা যায়, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মাতৃ-অ্যান্টিবডি পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারছে না।তাঁর মতে, করোনা মহামারির সময় তৈরি হওয়া ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’-এর প্রভাবও পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত। লকডাউনের সময় টিকাদান থেকে বাদ পড়া অনেক কিশোরী ও তরুণী এখন মা হচ্ছেন। তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত মাতৃ-অ্যান্টিবডি না পাওয়ায় নবজাতকেরাও হামের ঝুঁকিতে পড়ছে।সাধারণত মাতৃ-অ্যান্টিবডির সুরক্ষা তিন থেকে পাঁচ মাস থাকে। আট মাস বয়সে মাত্র ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ শিশুর শরীরে এই অ্যান্টিবডি অবশিষ্ট থাকে। অথচ এত দিন প্রথম হাম টিকা দেওয়ার বয়স ছিল নয় মাস। ফলে শিশুর জীবনের একটি পর্যায়ে সুরক্ষার ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল।বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক শিশুর ক্ষেত্রে জটিলতা বেশি। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকেও সাড়া মিলছে না। ফলে তাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে মৃত্যু হচ্ছে।তিনি বলেন, অনেক শিশু দুই ডোজ টিকা পায়নি এবং অপুষ্টিতে ভুগছে। তাঁদের গবেষণায় হামে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে বলে পাওয়া গেছে। নানা কারণেই এখনো শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে।আক্রান্ত শিশুদের শরীরে অ্যাডেনো ভাইরাসের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ এবং ওষুধে সাড়া না দেওয়া কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তবে পরীক্ষা ব্যয়বহুল হওয়ায় বর্তমানে অ্যাডেনো ভাইরাসের পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।আগাম প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্নজনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ ব্যবস্থাপনা না নেওয়া এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করাসহ সরকারের কিছু ভুলের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি হয়েছে। সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়া গেলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব ছিল। তিনি বলেন, ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি ও অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে। তাই শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করতে হবে। এরপর পরিকল্পিতভাবে টিকাদান ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হবে।

ছয় মাসে হামে হাজার শিশুর মৃত্যু, টিকাহীন ১০ জনে প্রায় ৯ জন