মনির হোসেন পাটোয়ারী: দেশি বিনিয়োগ
আকর্ষণে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য অন্যতম বড়
চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী
ও ঋণদাতাদের আস্থা অর্জন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং
অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং
বড় প্রকল্পের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার কারণে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে একজন দক্ষ উদ্যোক্তা
হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ব্যাংকিং খাতে
কর্মজীবন শুরু করা নাফিজ
সরাফাত বড় প্রকল্পের আর্থিক
ঝুঁকি, ঋণ কাঠামো ও
বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে উদ্যোক্তা হিসেবে
তিনি সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে
লাগিয়ে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে
বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত করেন।
এর অন্যতম
উদাহরণ ইউনিক মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটিতে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) প্রায় ৩৫০
মিলিয়ন ডলারের প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণচুক্তির
মাধ্যমে যুক্ত হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি
প্রকল্পের শেয়ারধারী হিসেবেও অংশ নেয়। কাতার
সরকারের মালিকানাধীন নেব্রাস পাওয়ার প্রকল্পটির ২৪ শতাংশ শেয়ার
নেয়।
এ প্রকল্পে
স্থানীয় উদ্যোক্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক
প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়। ফলে প্রকল্পটির
প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক
অংশীদারত্ব তৈরি হয়।
প্রকল্পটির জন্য
প্রায় ১৫ বছর মেয়াদি
৪৬৩ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহ করা
হয়। অর্থায়নে যুক্ত ছিল যুক্তরাজ্যের স্ট্যান্ডার্ড
চার্টার্ড ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, জার্মানির ডিইজি, সুইজারল্যান্ডের সার্ভ ও ওপেক ফান্ড।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের
পর এ অর্থায়ন পাওয়া
প্রকল্পটির আর্থিক কাঠামোর গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত
হয়।
এ বিষয়ে
একজন অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ
বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা কোনো একটি প্রকল্পে শুধু সম্ভাবনা দেখেই অর্থ বিনিয়োগ করেন না। তাঁরা উদ্যোক্তার সক্ষমতা, প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো, অংশীদারদের গ্রহণযোগ্যতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা যাচাই করেন। একটি প্রকল্পে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে যুক্ত করতে পারা উদ্যোক্তার সমন্বয় ও আস্থা তৈরির সক্ষমতার পরিচয় দেয়। নাফিজ সরাফাতের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
করোনা মহামারির
সময় বিশ্বজুড়ে সরবরাহব্যবস্থা ও নির্মাণকাজে বড়
ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত উৎপাদনে
আসে। প্রকল্পটির উৎপাদনক্ষমতা প্রায় সাত লাখ পরিবারের
বিদ্যুৎ চাহিদার সমপরিমাণ বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের
পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নাফিজ সরাফাতের
কাজের আরেকটি দিক হলো পেশাদার
ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা। তাঁর
সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিজ্ঞ ব্যাংকার, হিসাববিদ, নিরীক্ষক, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক পরামর্শকদের
সম্পৃক্ত করা হয়েছে। গ্র্যান্ট
থর্নটনের মতো আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা
প্রতিষ্ঠানও সংশ্লিষ্ট ছিল।
বিদ্যুৎ খাতের
পাশাপাশি ডিজিটাল অবকাঠামোতেও তাঁর উদ্যোগের কথা
উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের মে
মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (ইউএসটিডিএ) সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডকে প্রস্তাবিত ‘বাঘা-১’ আন্তর্জাতিক
সাবমেরিন কেবলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য অনুদান দেয়।
প্রকল্পটির লক্ষ্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথ সক্ষমতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থাকে
আরও নির্ভরযোগ্য করা।
বিশেষজ্ঞের মতে,
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আস্থা। বিনিয়োগকারীরা দেখতে চান স্থানীয় উদ্যোক্তা শুধু প্রকল্প শুরু করতে পারবেন কি না সেটাই মূল বিষয় না, মূল বিষয় হলো
দীর্ঘমেয়াদে
প্রকল্প
পরিচালনা,
আন্তর্জাতিক
অংশীদারদের
সঙ্গে
সমন্বয়
এবং সংকট মোকাবিলা করার সক্ষমতা তাঁর আছে কি না। ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ও উদ্যোক্তা হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতার সমন্বয় নাফিজ সরাফাতকে এ ক্ষেত্রে একটি বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা,
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজের সক্ষমতা, বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহ এবং বড় প্রকল্পে
দক্ষ পেশাজীবীদের সমন্বয় এই বিষয়গুলো নাফিজ
সরাফাতের উদ্যোক্তা হিসেবে দক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা
হয়।
বিদেশি
বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
তুলে ধরার পাশাপাশি প্রকল্পের
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা
দেখানোই তাঁর কাজের অন্যতম
বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই আন্তর্জাতিক
অংশীদারত্ব ও বৈদেশিক বিনিয়োগ
আকর্ষণের ক্ষেত্রে নাফিজ সরাফাতের ভূমিকা দেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে আলাদাভাবে আলোচিত।