উপমহাদেশের অন্যতম সুফি সাধক হযরত বাবা ফরিদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর (রহমাতুল্লাহি আলাইহি), যিনি বাবা ফরিদ নামে পরিচিত, তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার স্মৃতি ছড়িয়ে আছে উপমহাদেশের বাইরেও। ফিলিস্তিনের পবিত্র নগরী জেরুজালেম বা বায়তুল মুকাদ্দাসে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্থান আজও পরিচিত ‘বাবা ফরিদের চিল্লাগাহ’ ও ‘হিন্দুস্তানি সরাই’ (Indian Hospice) নামে।
জেরুজালেমে বাবা
ফরিদের আগমন
ঐতিহাসিক বর্ণনা
ও সুফি তাজকিরাগুলোতে উল্লেখ
রয়েছে, যৌবনকালে আধ্যাত্মিক সাধনা ও বিশ্বভ্রমণের অংশ
হিসেবে বাবা ফরিদ বায়তুল
মুকাদ্দাস সফর করেছিলেন।
বর্ণনা অনুযায়ী,
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে, আনুমানিক ১১৮৭ থেকে ১২০০
খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) ক্রুসেডারদের কাছ থেকে বায়তুল
মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করার পর বিভিন্ন
অঞ্চল থেকে সুফি, আলেম
ও দরবেশদের সেখানে আসা ও দ্বীনি
খেদমতে উৎসাহিত করা হয়।
এই সময়
বাবা ফরিদ জেরুজালেমে এসে
ইবাদত-বন্দেগি ও রিয়াজতে সময়
কাটিয়েছিলেন বলে বর্ণনা রয়েছে।
যেখানে চিল্লা করেছিলেন বলে
কথিত
বর্ণনা অনুযায়ী,
মসজিদুল আকসার প্রাঙ্গণ ও পুরোনো জেরুজালেমের
প্রাচীরের ভেতরের একটি গুহা ও
হুজরায় তিনি অবস্থান করেছিলেন।
সেখানে দীর্ঘ সময় চিল্লা ও
আধ্যাত্মিক সাধনা করেন বলে কথিত
আছে।
এ কারণেই
স্থানটি পরবর্তী সময়ে ‘বাবা ফরিদের চিল্লাগাহ’
নামে পরিচিতি পায়। আরও উল্লেখ
রয়েছে, তিনি মসজিদুল আকসার
প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজেও অংশ
নিতেন।
চিল্লাগাহ থেকে
হিন্দুস্তানি সরাই
সময়ের সঙ্গে
বাবা ফরিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি উপমহাদেশ থেকে আগত মুসাফিরদের
আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। হজ কিংবা
জেরুজালেম জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কা মুকাররমা ও বায়তুল মুকাদ্দাসে
যাওয়া উপমহাদেশের মানুষ এখানে অবস্থান করতেন বলে বর্ণনা রয়েছে।
পরে জায়গাটি
খানকাহ ও মুসাফিরখানার রূপ
নেয় এবং ‘হিন্দুস্তানি সরাই’
বা ‘Indian Hospice’ নামে পরিচিত হয়।
বংশপরম্পরায় চলছে
খেদমত
বিংশ শতাব্দীর
শুরুতে, ১৯২৩ সালে বায়তুল
মুকাদ্দাসের তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতির অনুরোধে উপমহাদেশ থেকে নজির হুসাইন
আনসারি নামের একজনকে স্থানটির দেখাশোনার জন্য ফিলিস্তিনে পাঠানো
হয় বলে উল্লেখ রয়েছে।
তিনি সাহারানপুরের বাসিন্দা ছিলেন।
নজির হুসাইন
আনসারি পরে সেখানেই স্থায়ীভাবে
বসবাস শুরু করেন এবং
এক ফিলিস্তিনি নারীকে বিয়ে করেন। তাঁর
বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে
হিন্দুস্তানি সরাই ও বাবা
ফরিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটির দেখাশোনা করে আসছেন বলে
বর্ণনা রয়েছে।
এখনো
সংরক্ষিত স্মৃতিচিহ্ন
যুদ্ধ ও
রাজনৈতিক নানা পরিবর্তনের মধ্যেও
জেরুজালেমের হিন্দুস্তানি সরাই ও বাবা
ফরিদের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানটি সংরক্ষিত রয়েছে বলে উল্লেখ করা
হয়। উপমহাদেশ থেকে আসা মুসাফির
ও জিয়ারতকারীরাও এখানে আসেন।
সরাইয়ের ভেতরে
রয়েছে একটি ছোট মসজিদ,
বাবা ফরিদের হুজরা এবং তাঁর চিল্লার
স্থান হিসেবে পরিচিত একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষ।
রয়েছে উপমহাদেশের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সফরের ছবিও।
বাবা
ফরিদের আধ্যাত্মিক প্রভাব উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে জেরুজালেম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল এমন বিশ্বাস তাঁর
অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত
চিল্লাগাহ ও হিন্দুস্তানি সরাই
তাই উপমহাদেশ ও বায়তুল মুকাদ্দাসের
মধ্যকার পুরোনো আধ্যাত্মিক যোগাযোগের একটি স্মারক হিসেবে
বিবেচিত হয়।