প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬
দিল্লিতে বিক্ষোভের স্থান হিসেবে বাদ জন্তর মন্তর, প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ
||
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরকে বিক্ষোভ ও সমাবেশের অনুমোদিত স্থান হিসেবে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচি, শ্রমিকদের দাবি এবং নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্থানটি নিয়ে এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ আরও সংকুচিত হতে পারে।‘আমার দেশ অনলাইন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার দিল্লি পুলিশের জারি করা এক আদেশে জন্তর মন্তরকে বিক্ষোভের অনুমোদিত স্থানের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। তবে আদেশে এ সিদ্ধান্তের নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।কেন জন্তর মন্তর নিয়ে সিদ্ধান্তভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত এল। সমালোচকদের অভিযোগ, সংশোধনপ্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলছে।অনলাইনে সংগঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আন্দোলনসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল জন্তর মন্তর। ওই আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘাতের পর জন্তর মন্তরের মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসে।বিক্ষোভের জন্য বিকল্প তিন স্থানজন্তর মন্তরের পরিবর্তে দিল্লিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ আয়োজনের জন্য তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। এগুলো হলো—রামলীলা ময়দান: দিল্লির কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত।বুরারি ময়দান: উত্তর দিল্লিতে অবস্থিত।সিবিডি ময়দান: পূর্ব দিল্লিতে অবস্থিত।কর্তৃপক্ষের যুক্তি, এসব স্থানে বিক্ষোভ ও সমাবেশ আয়োজন করা যাবে। তবে আন্দোলনকারীদের মতে, শুধু বিকল্প স্থান নির্ধারণ করলেই প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত হয় না।জন্তর মন্তর রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে, সংসদ ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে সেখানে বিক্ষোভ হলে রাজনীতিক, নীতিনির্ধারক ও সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি সহজেই আকর্ষণ করা সম্ভব হতো।মানবাধিকারকর্মী শবনম হাশমি বলেন, শহরের কেন্দ্রস্থলে এবং সংসদের কাছে হওয়ায় জন্তর মন্তর প্রতিবাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। তাঁর মতে, স্থানটির মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ভিন্নমত দমনের একটি পদক্ষেপ।তিন দশকের আন্দোলনের সাক্ষীজন্তর মন্তর মূলত ১৮ শতকে নির্মিত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। তবে এর পাশের সড়কটি ১৯৯৩ সাল থেকে বিক্ষোভের স্থান হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এরপর শ্রমিক সংগঠন, অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য, দুর্নীতিবিরোধী কর্মী, নারী অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে সেখানে সমাবেশ করেছেন।২০১১ সালে সমাজকর্মী আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল জন্তর মন্তর। শক্তিশালী লোকপাল আইন প্রণয়নের দাবিতে তাঁর অনশন দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরে আন্দোলনের পরিসর বাড়লে বিক্ষোভের বড় একটি অংশ রামলীলা ময়দানে স্থানান্তরিত হয়।কৃষকদের দাবি, নারী অধিকার, সরকারি নীতির বিরোধিতা এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে জন্তর মন্তর। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে বিক্ষোভের সময় ও পরিসর নিয়ে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে আইনি বিতর্কজন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আয়োজনের অধিকার নিয়ে অতীতেও আইনি বিতর্ক হয়েছে। ২০১৭ সালে ভারতের জাতীয় পরিবেশ আদালত (এনজিটি) শব্দদূষণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অসুবিধার কথা উল্লেখ করে সেখানে বিক্ষোভ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল।পরে ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ওই এলাকায় বিক্ষোভের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে জানায়, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর সেই বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। একদিকে জননিরাপত্তা, যান চলাচল ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের বিষয় রয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, প্রতিবাদের স্থান রাজধানীর কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে নিলে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা কঠিন হবে।ভারতের সংবিধানে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার স্বীকৃত। তবে নির্দিষ্ট স্থানে যেকোনো সময় ও যেকোনো আকারে বিক্ষোভ করার অবাধ অধিকার নেই। এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।জন্তর মন্তরকে বিক্ষোভের অনুমোদিত স্থানের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ফলে দিল্লিতে আন্দোলনের ধরন ও স্থান কীভাবে বদলাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তিন দশকের আন্দোলনের ইতিহাস বহনকারী স্থানটি নিয়ে এ সিদ্ধান্ত ভারতে নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিসরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।সূত্র: ডন, এএফপি ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
কপিরাইট © ২০২৬ 365 D News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত