প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেগের রায়ের পরও কাটেনি সিন্ধু পানি চুক্তির সংকট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
হেগের স্থায়ী
সালিশি আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের পর ভারত ও
পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬০ সালের সিন্ধু
পানি চুক্তি নতুন করে আইনি
ও কূটনৈতিক সংকটে পড়েছে। আদালত জানিয়েছে, চুক্তিটি এখনো কার্যকর এবং
কোনো পক্ষ একতরফাভাবে তা
স্থগিত বা অকার্যকর করতে
পারে না। তবে ভারত
এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সালিশি কাঠামোর এখতিয়ারই তারা স্বীকার করে
না।ফলে আদালতের
রায় এলেও দুই দেশের
মধ্যে পানি নিয়ে বিরোধের
বাস্তব সমাধান হয়নি। বরং চুক্তির ভবিষ্যৎ
নিয়ে আইনি অবস্থানের পাশাপাশি
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনও
আরও স্পষ্ট হয়েছে।ছয়
নদীর পানি ভাগ১৯৬০ সালে
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ভারত ও পাকিস্তানের
মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত
হয়। চুক্তিতে ছয়টি নদীর পানি
ব্যবস্থাপনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। পূর্বাঞ্চলীয়
রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর
পানি ব্যবহারে ভারতের প্রধান অধিকার রাখা হয়। আর
পশ্চিমাঞ্চলীয় সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব
নদীর পানিতে পাকিস্তানের প্রধান অধিকার নির্ধারিত হয়।তবে পশ্চিমাঞ্চলীয়
নদীগুলোতেও ভারতকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারের সুযোগ
দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ
উৎপাদনের বিষয়টিও রয়েছে।দুই দেশের
মধ্যে যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ ও রাজনৈতিক সংকটের
মতো নানা ঘটনা ঘটলেও
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে
চুক্তিটি কার্যকর ছিল। কিন্তু ২০২৫
সালের এপ্রিলে পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর পরিস্থিতি বদলে
যায়।ভারত তখন
চুক্তিটি ‘অ্যাবেয়ান্স’ বা স্থগিত অবস্থায়
রাখার ঘোষণা দেয়। ভারতের বক্তব্য
ছিল, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের সমর্থন বন্ধ না হওয়া
পর্যন্ত চুক্তির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হবে
না।এর ফলে
পানি ব্যবস্থাপনার পুরোনো কাঠামোটি সরাসরি দুই দেশের নিরাপত্তা
ও কূটনৈতিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।হেগের
রায়, ভারতের আপত্তিএরপর বিরোধ
গড়ায় আইনি পর্যায়ে। হেগের
কোর্ট অব আরবিট্রেশন চুক্তির
আওতায় বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়। আদালতের সিদ্ধান্তে
বলা হয়, চুক্তির আওতায়
কোনো পক্ষ একতরফাভাবে এর
কার্যকারিতা স্থগিত বা বাতিল করতে
পারে না।ভারতকে চুক্তির
বাধ্যবাধকতা পালনের কথা বলার পাশাপাশি
জম্মু-কাশ্মীরের রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসংক্রান্ত কিছু নির্মাণ কার্যক্রমে
অন্তর্বর্তী বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়।তবে ভারত
শুরু থেকেই এই সালিশি প্রক্রিয়ার
এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করে আসছে। সর্বশেষ
রায়ও তারা গ্রহণ করেনি।
ফলে আদালতের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের অবস্থানকে আইনি সমর্থন দিলেও
বাস্তবে তা কার্যকর করার
পথ সহজ হয়নি।পাকিস্তানের
জন্য পানি কেন গুরুত্বপূর্ণহেগের সিদ্ধান্তকে
পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে,
ভারত একতরফাভাবে সিন্ধু পানি চুক্তির কার্যকারিতা
স্থগিত করতে পারে না।
আদালতের রায় সেই অবস্থানের
সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।তবে রায়ের
পর পাকিস্তানের বক্তব্যে শুধু আইনি অবস্থানের
বিষয়টি নয়, চুক্তির আওতায়
আবার আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনার কথাও এসেছে।পাকিস্তানের জন্য
সিন্ধু অববাহিকার পানি জাতীয় নিরাপত্তা
ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশটির কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পানীয় জলের
বড় একটি অংশ এই
নদীব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই
পানি নিয়ে অনিশ্চয়তা ইসলামাবাদের
জন্য শুধু দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক
সমস্যা নয়।রায়
বাস্তবায়নের প্রশ্নআন্তর্জাতিক আদালত
বা সালিশি সংস্থা কোনো চুক্তির আইনি
ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু
সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র যদি সেই সংস্থার
এখতিয়ারই স্বীকার না করে, তাহলে
রায় বাস্তবায়নের রাজনৈতিক পথ কঠিন হয়ে
যায়।ভারতের অবস্থান
এখন পর্যন্ত স্পষ্ট তারা হেগের সংশ্লিষ্ট
সালিশি কাঠামোর এখতিয়ার মানছে না। তাই রায়টি
আইনি বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুই দেশের
পানি ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে এমন নিশ্চয়তা
নেই।অন্যদিকে ভারতও
দীর্ঘমেয়াদি পানি-সংঘাত থেকে
পুরোপুরি সুবিধা পাবে, এমন নয়। উজানের
দেশ হিসেবে ভৌগোলিক সুবিধা থাকলেও নদীর পানি ব্যবস্থাপনার
সঙ্গে পরিবেশ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলবিদ্যুৎ, কৃষি ও নিম্ন
অববাহিকার মানুষের স্বার্থ জড়িত।শুধু
আদালতে সমাধান নয়সিন্ধু নদীর
পানি নিয়ে ভবিষ্যতের বিরোধ
সম্ভবত শুধু আদালত বা
সালিশি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেটানো যাবে না। নদীর
পানি সীমান্ত মানে না। তাই
পানি প্রবাহ, জলাধার পরিচালনা, বন্যার তথ্য, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সংরক্ষণের
মতো বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তানের
সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে।১৯৬০ সালের
চুক্তি তৈরিতে বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বর্তমান সংকটের মূল চরিত্র রাজনৈতিক।
একই সঙ্গে কোর্ট অব আরবিট্রেশন ও
নিউট্রাল এক্সপার্ট চুক্তির আওতায় থাকা পৃথক বিরোধ
নিষ্পত্তি ব্যবস্থাগুলো নিয়েও দুই দেশের মতপার্থক্য
রয়েছে।ফলে তৃতীয়
কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভর করে
সমস্যার সমাধান হওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত।চুক্তির
ভবিষ্যৎ কোন পথেএখন বড়
প্রশ্ন হলো, ১৯৬০ সালের
সিন্ধু পানি চুক্তি আগের
কাঠামোয় ফিরবে, নাকি পরিবর্তিত বাস্তবতার
আলোকে এর কোনো পুনর্বিন্যাস
হবে।ভারত পুরোনো
অবস্থায় ফিরে যেতে অনাগ্রহী।
অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষেও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা কঠিন। ফলে
ভবিষ্যতে আলোচনায় চুক্তির প্রযুক্তিগত বিধান, পানি ও জলবিদ্যুৎ
প্রকল্প, তথ্য বিনিময় এবং
বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো নিয়ে আলোচনা হতে
পারে।তবে এসব
উদ্যোগকে এখনই আনুষ্ঠানিক ‘পুনঃআলোচনা’
বা নতুন চুক্তির সূচনা
হিসেবে দেখার মতো নিশ্চিত প্রমাণ
নেই।হেগের রায়
তাই সিন্ধু পানি বিরোধের শেষ
কথা নয়। বরং এটি
ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের পানি সংকটকে নতুন
একটি আইনি ও কূটনৈতিক
পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আদালতের
সিদ্ধান্ত ভারত গ্রহণ করেনি,
পাকিস্তান তা স্বাগত জানিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত এই নদী অববাহিকার
ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আদালতের রায়ের পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক
সদিচ্ছা, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং বাস্তব পানি
ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার সমন্বয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র:
সাউথ
এশিয়া
মনিটরে প্রকাশিত ভারতীয় সাংবাদিক ও ভাষ্যকার রাজু কোর্তির লেখা
কপিরাইট © ২০২৬ 365 D News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত